বান্দরবানে দরিদ্র শিশুর চিকিৎসায় ফেসবুকে ব্যাপক সাড়া

এন.এ জাকির ও আলাউদ্দিন আলিফ, মৈত্রী অনলাইন
প্রকাশ: রবিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৭ সময়- ৩:৩২ অপরাহ্ন

Untitled-1

বান্দরবান :  যে বয়সে বই হাতে স্কুলে যাওয়ার কথা, সে বয়সে সংসারের হাল ধরেছে নূর আলম। বাবাকে হারিয়ে অল্প বয়সেই পৃথিবীকে বুঝে গেছে শিশুটি। মা আর তার ছোট্ট সংসারের খাবার জোটাতে কাজ নিয়েছে চায়ের দোকানে। হতাশার দীর্ঘশ্বাস থাকলেও সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু জীবনের সব হিসাব পাল্টে গেছে গত ২ জানুয়ারি। পাহাড়ি এই জেলার গোরস্থান মসজিদ এলাকার রাস্তা পার হওয়ার সময় ঘটে দুর্ঘটনা। ঘাতক ট্রাক থেতলে দেয় নূর আলমের ডান পা। চিকিৎসার জন্য শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ভেঙ্গে যাওয়া পা ঠিক করতে ২-৩ লাখ টাকার প্রয়োজন হবে বলে জানান চিকিৎসক। কিন্তু এত টাকা কে দেবে? আর এই শিশু শ্রমিকের পরিবার কোথা থেকেই বা জোগাড় করবে এই টাকা?

স্বামী হারানোর ব্যথা কোনোভাবে সহ্য করে নিয়েছেন তার অভাবী মা। কিন্তু এবার শেষ সম্বল ছেলেকে হারিয়ে কীভাবে বাঁচবেন তিনি!

দুর্ঘটনার দিন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত আমজাদ হোসেন পাশেই ছিলেন। চোখের সামনেই ছোট নুর আলমকে জুবুথুবু হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছেন। দুর্ঘটনায় আক্রান্ত শিশুটিকে দেখে কেঁদে ওঠে তার মন। ছোটবেলায় টাকার অভাবে নিজের বাবার চিকিৎসা ভালো মত হয়নি। বাবাকে হারিয়েছেন। তাই অভাবী মানুষদের প্রতি তার দুর্বলতা আগে থেকেই। কিন্তু তার ক্ষমতাও যে সীমিত।

দেখতে দেখতে কেটে যায় দুই দিন। হঠাৎ শোনেন শিশুটি মারা গেছে। ভারাক্রান্ত মনে সারাদিন কাটালেও রাতে খবর পান শিশুটি মরেনি। তবে তার চিকিৎসা সহজলভ্য নয়। বেশ বড় অংকের টাকা দরকার না হয় চিরদিনের মত হারাতে হবে ডান পা। চিন্তায় আমজাদের চোখের কোণে জমা হল দু’ফোটা জল। সমাজের মানুষদের প্রয়োজনে কাজ করেছেন আগেও। বন্যা এবং ঈদের সময় মানুষের দানের ৭ হাজার টাকাও তার কাছে জমা ছিল। সেই টাকা দিয়ে দিলেন। কিন্তু মরুভূমিতে কি এক বালতি পানিতে কিছু হয়?

16358393_1409962889035427_1108384278_n

ফরিদুল আলম সুমন। পেশায় সাংবাদিক। এর আগেও বান্দরবানে গরীব দুস্থদের সহায়তায় ফেসবুক বেশ প্রচারণা চালিয়েছেন। সফলতাও ঈর্ষণীয়। সততা আর নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে শুধু ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েও যে মানুষের জন্য কাজ করা যায় তার উত্তম উদাহরণ সুমন। ফরিদের অনুসরণে এবার আমজাদ নিজের ফেসবুক পোস্টে দিলেন সেই অসহায় শিশুর ছবি ও ভিডিও। মানবিক আবেদন জানিয়ে সাহায্য চাইলেন বন্ধুদের কাছে।

প্রথমদিন সাড়া পেলেন পরিচিত কয়েকজন বড় ভাইয়ের কাছে। আস্তে আস্তে যুক্ত হল পরিবারের সদস্যরা। নতুন দুইজন সহযোদ্ধাও পেয়ে গেলেন। রিজভি রাহাত ও জিহাদ। আমজাদের স্ট্যাটাস শেয়ার করলেন তারাও। এভাবে এক দুইজন করে করে ফেসবুক যোদ্ধার সংখ্যা বাড়তে থাকল। সাহায্য আসতে থাকল সাত সাগরের ওপার থেকেও। মরুভূমির দেশ, বরফের দেশ, উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশের ফেসবুক বন্ধুরাও সাহায্যেরা হাত বাড়ালো শিশু নুর আলমের জন্য। এই যোদ্ধারা রাইফেল বা কলম হাতের কোন যোদ্ধা নয়। তারা এমন এক কমিউনিটিতে যুদ্ধ করছে যে কমিউনিটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের চেয়ে বেশি।

শিশু নুর আলমের জন্য তার প্রচেষ্টা এভাবেই বর্ণনা করছিলেন আমজাদ হোসেন। তবে গল্প এখানেই শেষ নয়। এই সাহায্য চাইতে গিয়ে সবাই যে আমজাদকে বাহবা দিয়েছে এমনটা নয়। স্ট্যাটাসে অনেকে কটু কথা শোনাতে দ্বিধা করেননি। আমজাদ কেঁদেছে কিন্তু ভেঙ্গে পরেনি। ফরিদ ভাই আবার অনু্প্রেরণা হয়ে দেখা দিয়েছে। আমজাদের একটি স্ট্যাটাস থেকে শুরু করা মানবিক আবেদন প্রতিদিনের অনুদানের হিসেব নিকেশ হয়ে ফেসবুকের পোস্টে এসেছে। ৭ হাজার টাকা থেকে শুরু হওয়া টাকার পরিমাণ এখন লাখ টাকা ছাড়িয়ে।Untitled-2

আমজাদ বলেন, আমি জীবনে কখনো জন্মদিন পালন করিনি। ২৬ জানুয়ারি আমি জন্মদিন পালন করেছি নুর আলমের সঙ্গে। নুর আলমকে নিয়ে করা ভিডিও দেখেছেন ১ লাখের বেশি ফেসবুক বন্ধুরা। এদেরকে আপডেট দিতে নুর আলমকে সরাসরি দেখতে আমি ঐদিন চট্টগ্রাম আসি। তার অবস্থার উন্নতি আমাকে অনুপ্রেরণা দেয়। আমি আল্লাহর কাছে তার সুস্থতার জন্য মানুষের দোয়া চাই।

একটা শিশুর জন্য দিন রাত টাকা সংগ্রহের চেষ্টা চালিয়েছেন। পরিশ্রমটাও কম হয়নি। নিজেকে কতটা সফল মনে করছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আমজাদ হোসেন দৈনিক সচিত্র মৈত্রী অনলাইনকে বলেন, আমার উদ্দেশ্য ছিল শিশুটির ডান পা ভালো করার জন্য নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালানো। আমি উদয়অস্থ খেটেছি। মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি। আজ শিশুটি অসহায় বলে তার চিকিৎসা হবে না আমি মেনে নিতে পারিনি। কত ভাবেই কত টাকা নষ্ট হয় মানুষের! সেই মানুষ কি তাদের খরচের টাকা থেকে সামান্য টাকা নুর আলমকে দিতে পারবে না? আমার বিশ্বাস ছিল। আশা ছিল। আমি পারবো। আসলে আমরা পারবো। সমাজে খারাপ মানুষের চেয়ে ভালো মানুষের সংখ্যাই বেশি। নুর আলমকে দেখা আমাদের দায়িত্ব। নিজেকে হিরো করতে নয় বরঞ্চ নিজের বা সমাজের দায়িত্ব থেকেই এই শিশুর জন্য চেষ্টা করা। বিশ্বাস করেন আমরা সফল। আমরা পেরেছি। এই কৃতিত্ব বান্দরবানের সব মানুষের। আমার কৃতজ্ঞতা সৃষ্টিকর্তার পরে সবার জন্য। এমনকি যারা আমাকে নিয়ে বাজে মন্তব্য করেছেন তাদের জন্যও।

শিশু নূর আলমের চিকিৎসার কাজ সঠিকভাবেই এগিয়ে চলছে। অপারেশনের জন্য তাকে প্রস্তুত করতে প্রতিদিন চলছে ড্রেসিংয়ের কাজ। আরো একমাস চলবে এই ড্রেসিং। তারপর অপারেশন। এদিকে সহযোগিতার হাতও প্রসারিত হচ্ছে। নুর আলম সুস্থ হবেই। সারা বান্দরবানের মানুষ নুর আলমের সঙ্গে রয়েছে। নুর আলমের পা ভালো হবেই।

নূর আলমকে সাহায্য করতে ০১৯৬৩ ৬৩৫ ৩৬৩ নাম্বারে বিকাশ করতে পারেন।

মৈত্রী/ এনএজে/ এএ

Tags: , ,

Banner