পোশাক শিল্পে স্টোর খাতে কাজের বাস্তবচিত্র

পোশাক শিল্প : স্টোর যেখানে অবিচ্ছেদ্য অংশ

মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন, উপ-মহাব্যবস্থাপক, টেক্সইউরোপ (বিডি) লিমিটেডে
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সময়- ৩:২৭ পুর্বাহ্ন

store main

ঢাকা :  পোশাক শিল্প(আরএমজি) খাতে স্টোর ডিপার্টমেন্টের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। উৎপাদনশীল কোন প্রতিষ্ঠানের কারখানাতে উৎপাদনকে মেরুদণ্ড বলা হলেও স্টোর কে বলা হয় কারখানার হৃদয়। সে হিসেবে স্টোরে দক্ষ লোকজনের বিকল্প নেই। কিন্তু দেশের পরিপেক্ষিতে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আরএমজি সেক্টরে স্টোর ব্যবস্থাপনায় দক্ষ লোকজনের অভাব আরো বেশি প্রতীয়মান হয়। স্টোর ডিপার্টমেন্ট সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে দৈনিক সচিত্র মৈত্রীতে কলাম লিখেছেন টেক্সইউরোপ (বিডি) লিমিটেডের স্টোর ডিপার্টমেন্টের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন।

১৯৯৯ সালের শেষের দিকে আরএমজি সেক্টরে কাজের হাতেখড়ি। স্টোর ডিপার্টমেন্ট দিয়েই কাজের যাত্রা শুরু। অতঃপর কয়েক বছর একাউন্টস, পারচেস আর প্রোডাকশন বিভাগে ঘুরে ২০০৬ সালে স্টোর ডিপার্টমেন্টে পুনরায় যাত্রা শুরু। একটি পোশাক কারখানাতে অসদুপায়ে আয় রোজগারের যে বিশাল সুযোগ রয়েছে তন্মধ্যে স্টোর অন্যতম। আমার চেনা অচেনা অনেকেই আজ কোটিপতি। আয় ব্যয়ের হিসাব কিছুতেই মিলাতে পারিনা। আজকের বিষয় অবশ্য সততা নয়। স্টোর এবং ক্যারিয়ার।

শুধু বাংলাদেশেই নয়, এই দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে স্টোর বিভাগ একটি অবহেলিত বিভাগ। এখানে কোন মেধাবী ছাত্রের উপস্থিতি একেবারেই নগণ্য। মেধাবী বলতে সার্টিফিকেটধারী শিক্ষার্থীদের কথা বলছি। ব্যবসায় প্রশাসনে উচ্চতর ডিগ্রি অথবা স্নাতক পাশ করে দেশের কোন ছাত্র দুঃস্বপ্নেও স্টোরে কাজ করতে আগ্রহ রাখে না বা ভাবতে পারেন না । বেশিরভাগ শিক্ষার্থী মার্চেন্ডাইজিং, প্ল্যানিং, এইচআর অথবা আই ইতে যেতে। স্টোরে ক্যারিয়ার নেই এমন একটি বদ্ধমূল ধারণা এই সেক্টরের প্রতি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করে না। উল্লেখিত বিভাগে যেতে পারলে ৮/১০ বছরেই বিগ বস। অথচ স্টোর বিভাগের দক্ষতার উপর নির্ভর করে উৎপাদনের গতিবেগ, গুনগত মান ও সঠিক সময়ে পন্য সরবরাহ। কোম্পানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে এবং অপচয় রোধে একটি প্রোএকটিভ ষ্টোর টিম বিশাল অবদান রাখতে পারে। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, এই বিভাগে যারা কাজ করে তাদের বেশিরভাগই স্টোর বিভাগের জন্য উপযুক্ত নয়। অন্য কোন খাতে চাকরি যাদের জোটেনি অথবা কারও দূর সম্পর্কের আত্মীয় বেকার পরে আছে এমন কর্মীকে এনে বসিয়ে দেয়া হয় স্টোরে। ন্যূনতম কোন প্রশিক্ষণ তাদেরকে দেয়া হয়না।

store pic

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই অনুপযুক্ত কর্মীরা যখন কাজ শুরু করে তখন তাদের সামনে কোন কর্ম নির্দেশিকা থাকেনা। কখনো মার্চেন্ডাইজারের নির্দেশনায়, কখনো প্রোডাকশনের লোকজনের নির্দেশনায়, কখনো এডমিনের দেখানো পথে অথবা একাউন্টস এর নির্দেশনায় এরা কাজ করে থাকে। ফলে স্টোরের লোকদের মধ্যে এক ধরনের কিংকর্তব্যবিমূঢ়তা কাজ করে এবং এত এত বসের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে করতে নিজেদেরকে লিডার হিসেবে তৈরী করার কোন চিন্তা তাদের মাথায় আসেনা বা করতে পারে না। অন্যদিকে এরা প্রোডাকশনের সাথে সম্পৃক্ততার কারণে ডিউটি আওয়ার শুরু হয় একসাথে কিন্তু শেষ কখন হবে তা কেউ জানে না। এই দেশে বেশীরভাগ শিপমেন্ট হয় গভীর রাতে। বায়ারের আবশ্যিক শর্তের জন্য এমনটা হয় কি না আমার জানা নেই। কিন্তু শিপমেন্ট দিয়ে যেতে হবে যত রাতই হোক। এখানে একটা কথা না বললেই নয় আর তা হল সাপ্লাই চেইনের চাহিদানুযায়ী স্টোর পন্য হস্তান্তর করবে সিঅ্যান্ডএফ (C&F) কে কমার্শিয়াল এর প্রতিনিধির সাক্ষাতে। কিন্তু ইপিজেড আর কিছু বহুজাতিক কোম্পানি ছাড়া আর কোথাও এই নিয়ম অনুসরণ করতে আজ পর্যন্ত দেখিনি।

লেখক :  মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন
লেখক : মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন

এই রাতের ৩-৪ টা পর্যন্ত শিপমেন্ট দেয়া লোকগুলোকে আবার পরেরদিন সঠিক সময়ে অফিসে হাজির হতে হয় অন্যথায় এইচ আর এডমিন নানারকম ভয়ভীতি দেখায়। ফলে লোকগুলো ধীরে ধীরে একধরনের খিটখিটে মেজাজের হয়ে যায়। এরা ভুলে যায় স্মার্টনেস, ভুলে যায় ব্যক্তিত্ব এবং সাংগঠনিক আচরণ। প্রোডাকশন এর চেয়ে বেশী পরিশ্রম করলেও দিন বা মাস অথবা বছর শেষে এরা আর্থিক কিংবা অফিসিয়াল ফল ভোগ করে অনেক কম। এমনকি সবচেয়ে কম।

গেল দশকে এই যে বিভিন্ন রকমের অডিট হয় এখানেও স্টোর ডিপার্টমেন্ট এর ভূমিকা ব্যাপক। এমনকি অডিট ফেল করার পাশাপাশি এদের অবহেলায় বায়ারের কাজ পর্যন্ত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। অ্যাকাউন্টস, কমার্শিয়াল, স্টোর এবং মার্চেন্ডাইজারকে সাপোর্ট টিম। এখানেও খাতা কলমে সবার কাজ থাকলেও শারীরিকভাবে পরিশ্রম করতে হয় একমাত্র স্টোরের লোকদের। উল্লেখিত ডিপার্টমেন্টগুলোর কাউকেই কমপ্লায়েন্স দেখতে না হলেও স্টোরের লোকদের তাও নিশ্চিত করতে হয়।

এই সেক্টরটা খুব বেশি বড় না হলেও আমাদের দেশের যেহেতু সবচেয়ে বড় সেক্টর তাই আমার সাবজেক্ট এর বাইরের কিছু কথা প্রাসঙ্গিক হওয়াতে চলে আসতে পারে যদিও তা মূখ্য নয় কিন্তু একেবারে বাদ দেয়ার মতোও নয়।

স্টোরের আরেকটি প্রধান সমস্যা হলো জায়গার স্বল্পতা। বেশীরভাগ মালিক কারখানা স্থাপনের সময় প্লান করেন কাঁচামাল কিনবেন, প্রোডাকশন করবেন আর শিপমেন্ট করবেন। ব্যাস, প্রোডাকশনে যত পারা যায় গাদাগাদি করে মেশিন সেটআপ করে উৎপাদন বেশী করা আর রপ্তানী বাড়ানো। কাঁচামালের স্টোর, ফিনিশ প্রোডাক্ট এর স্টোর কিংবা প্রোডাকশন ফ্লোরে ডব্লিউআইপি(WIP) রাখার মত পর্যাপ্ত জায়গা রাখে না বা রাখার প্রয়োজনীয়তা বুঝানোর মত কেউ নেই। এই যে জায়গার অভাবে মালামাল রাখতে না পারা এটারও সবচেয়ে বড় প্রেশারটা স্টোরের লোকরা মাথায় নিয়ে ঘুরতে হয়। একেতো উন্নত প্রশিক্ষণ না থাকায় কিভাবে অল্প জায়গায় অধিক মালামাল রাখা যায় তা তারা জানেনা, অন্যদিকে পুরোনো মেয়াদোত্তীর্ণ কাচামালে গুদাম হয়ে থাকে ডাস্টবিনের চেয়েও খারাপ আর জঘন্য। ফলাফল যা হবার তাই, যথাসময়ে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল খুঁজে পাওয়া যায়না। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে অবশেষে খুঁজে পেলেও অনেক সময় পন্যের গুনগত মান নষ্ট হয়ে যায়। এর কারণ পন্য কিভাবে রাখা দরকার অথবা কোন পরিবেশে রাখতে হবে এ বিষয়ে কোন ধারণা তাদের থাকেনা বা দেয়া হয়না। বেশীর ভাগ পোশাক শিল্পের কারখানায় প্রয়োজনীয় সবগুলো সুযোগ সুবিধা থাকেনা। যেমন: ওয়াশিং, এমব্রয়ডারি, প্রিন্টিং ইত্যাদি।

এইসব ডব্লিউআইপি অপারেশন বা রাখার জন্য যখন কোথাও জায়গা নাই তখন মরার উপর খরার ঘায়ের মত স্টোরে পাঠিয়ে অব্যবস্থাপনার লোকজন নিশ্চিন্তে ঘুমান আর স্টোরের লোকের অবস্থা তখন মধুসূদন ত্রাহি। ফিনিশ প্রোডাক্ট রাখার জন্য যে পরিমাণ জায়গা বরাদ্ধ আছে তার পাঁচ গুণ বেশি মজুদ পড়ে থাকে। এই জন্য পাঁচ গুণ অতিরিক্ত চাপ হিসেব রাখা আর খুঁজে খুঁজে শিপমেন্ট দেয়াটাও সেই আমার মত কোথাও চাকরি খুঁজে না পাওয়া লোকদেরকেই করতে হয়!

store pic 1প্রত্যেক মাসে ষ্টেশনারী খাতে একটা বরাদ্ধ থাকে। সব কোম্পানিতে অবশ্য থাকে না। তো বরাদ্দকৃত বাজেট কেনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও বিতরণের ক্ষেত্রে হয়না। এরপর মাসের ৩য় প্রান্তিকে এসে কাগজ কলম দিতে না পারার অপরাধে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে অনেককেই জানি তারা শুধুমাত্র এই কারনে চাকরী ছেড়ে দিয়েছে। জায়গা স্বল্পতার চাপ নিতে না পেরে অনেক বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য লোক ত্যাগ করেছে এই পেশা।

অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিক মনে প্রাণে চান তার সবকটা ডিপার্টমেন্ট ভাল থাকুক, সুন্দর থাকুক। কিন্তু কিছু সুবিধাভোগী মালিকের কাছাকাছি কর্মকর্তা অন্যদের সুযোগ সুবিধা কমিয়ে নিজেদের সুবিধাগুলো বাড়িয়ে নেবার প্রবনতার কারনেও স্টোর বিভাগ পিছিয়ে আছে। ধরুন, কোন একটা কোম্পানীতে স্টোর ডিপার্টমেন্ট ফাইনান্সের তত্ত্বাবধানে অথবা এডমিনের তত্ত্বাবধানে। এখানে স্টোরকে কখনো সেই দৃষ্টিতে দেখা হয়না যেভাবে দেখা হয় একাউন্টস কিংবা এডমিনের অন্য সাপোর্ট টিমকে।

পরবর্তী অংশ দ্বিতীয় পর্বে

মৈত্রী/ জেইউ/ এএ

Banner