পোশাক শিল্পে স্টোর খাতে কাজের বাস্তবচিত্র

পোশাক শিল্প : স্টোরের ভূমিকা ও গুরুত্ব

মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন, উপ-মহাব্যবস্থাপক, টেক্সইউরোপ (বিডি) লিমিটেডে
প্রকাশ: রবিবার, ১৫ অক্টোবর ২০১৭ সময়- ৯:৪১ অপরাহ্ন

store dmoitry

ঢাকা : গত পর্বে একটি পোশাক শিল্প কারখানাতে স্টোরের মূল কার্যাবলী সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছিল। এ পর্বে স্টোরের ভূমিকা ও গুরুত্ব সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে। স্টোর ডিপার্টমেন্ট সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে দৈনিক সচিত্র মৈত্রীতে কলাম লিখেছেন টেক্সইউরোপ (বিডি) লিমিটেডের স্টোর ডিপার্টমেন্টের উপ-মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন। আজ কলামের দ্বিতীয় ও শেষ পর্ব।

বিগত ৭/৮ বছরে বিভিন্ন বায়ারের বিভিন্নরকম অডিটের পাশাপাশি এখন আরো অনেকরকম অডিট হয়। দুঃখজনক বিষয় হল অডিটকেই আমাদের ব্যবস্থাপকগণ মারাত্মক ভয় পান। অডিটের ২/৩ দিন আগে থেকে শুরু হয় অডিট মোকাবেলার প্রস্তুতি যেন কোন ঘূর্ণিঝড় আঘাত করবে।

প্রোডাকশন ফ্লোর, ফিনিশিং ফ্লোর, প্যাকেজিং এরিয়া, মেইনটেইনেন্স কক্ষ যার যা কিছু অতিরিক্ত এবং পুরোনো জঞ্জাল আছে যা এতদিন বুকে আগলিয়ে রেখেছিল সেসব আসতে থাকে স্টোরে। যেন এটা আশ্রয়কেন্দ্র। সবাই মনে হয় ভুলেই যান অডিট স্টোরেও হবে। শুধু হবে বললে কম হবে, শুরুটাও হবে স্টোরে আর শেষটাও হবে স্টোর দিয়ে।

কোন অডিট যখন শুরুতেই ভাল কিছু দেখেন তখন তার প্রভাব মনের মধ্যেও পড়ে এবং একটা ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে পরবর্তী ধাপগুলো দেখা হয়। তাই স্টোরের অডিটের প্রস্তুতিটা সবচেয়ে বেশী ভাল হতে হয়। আমার এই সুদীর্ঘ কর্মজীবনে যতগুলো অডিটের সম্মুখীন হয়েছি আলহামদুলিল্লাহ কোনটাতেই ৯০ এর নীচে মার্ক পাইনি। যাও কিছু নাম্বার হারাতাম তাও হয়তো বিষয়টা জানতাম না অথবা এটা কর্তৃপক্ষের সরাসরি সিদ্ধান্তের ব্যাপার ছিল। আমি চাই অডিটের জন্য আলাদা কোন প্রস্তুতি না নিয়ে ২৪/৭ আমার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা। ঘোষিত অথবা অঘোষিত যেকোন অডিট যেকোন সময় হতে পারে তার জন্য আলাদা কিছু করার দরকার নাই।

store pic 1

বেশ কিছু কোম্পানী অডিটের মোকাবেলায় আরো একধাপ এগিয়ে। কয়েক ডজন কবার্ড ভ্যান ভাড়া করে অতিরিক্ত মালামাল তাতে বোঝাই করে অডিট পার করে। এরপর যেই লাও সেই কদু। শ্রমিক আর কর্মচারীগণ এখান থেকে একটা নীরব বার্তা পায়। আর তা হলো প্রতারণা। এটা একটা নেতিবাচক কাজ আমাদের সবার উচিত এটা এড়িয়ে চলা।

আমাদের দেশে যেহেতু অটোমেশন এবং রিলেটেড সাপোর্ট কম তাই এখানে এখনো লোডিং আনলোডিং এর মত একটা বড় কাজ শ্রমিক নির্ভর যা আমাদের নীতি নির্ধারকগনতো বুঝেন না এমনকি সরকারও না। যারা রাত বিরাতে ৩০/৪০/৫০ কেজি ওজন মাথায় নিয়ে কোম্পানির সরবরাহের গতিবেগ ঠিক রাখে তাদের বেতন ফুলের ঝাড়ু দিয়ে টাইলসের উপর যারা বাতাস করে তাদের চেয়ে কম।

স্টোরে এত হেভিওয়েট লোকের দরকার নাই- আর এত সুন্দর করে কি নোবেল পুরস্কার পাব? এই ধরনের মন্তব্য করার মত লোকেরাই অনেক ক্ষেত্রে এই সেক্টরের প্রধান আসন দখল করে বসে আছেন। এরা এই সেক্টর থেকে নিতে এসেছে। দিতে আসেনি। এ জাতীয় বস বা লিডার যতদিন চেয়ার দখল করে থাকবে ততদিন স্টোরের জন্যতো বটেই মালিকের জন্যেও অসম্ভব ক্ষতির কারণ তা শুধু সময় এলেই টের পাওয়া যাবে।

সাধারণত স্টোরের কাছে যে চাওয়াগুলো থাকে তা হল:

লেখক : মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন
লেখক : মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন

১) যথা সময়ে সঠিক ইনভেন্টরি রিপোর্ট,
২) প্রয়োজনীয় সময়ে সঠিক মালামাল সরবরাহ করা,
৩) মালামাল সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা,
৪) অর্ডার অনুযায়ী শর্ট লিস্ট করা ও টাইম টু টাইম আপডেট করা,
৫) অর্ডার শেষে রিকনসাইলিয়েশন করা,
৬) অপ্রয়োজনীয় মালামাল রুটিন করে স্টোর থেকে সরানোর ব্যবস্থা করা।
৭) মালামাল গ্রহণ ও বিতরণের সকল রেকর্ড সংরক্ষণ করা।
৮) পণ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে পরিমাণ ও গুণগত মান যাচাই করা।
৯) গৃহীত মালামাল স্ট্যান্ডার্ড কিনা তার অনুমোদন নেয়া।
১০) কমন আইটেমের ক্ষেত্রে মাসিক বাজেট করা ও বাজেট অনুযায়ী বিতরণ করা।
১১) ঝুঁকিপূর্ণ দ্রব্য আদান প্রদানের সময় পিপিই(PPE) ব্যবহার করা,
১২) ঝুঁকিপূর্ণ দ্রব্য সম্পর্কে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা।
১৩) প্রত্যেক পন্যের পরিচিতি লেবেল আছে কিনা তা নিশ্চিত করা।
১৪) মাঝে মাঝে স্টক চেক করা।
১৪) স্টোর পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা।
আরও অন্যান্য……..

উপরোক্ত কাজগুলো সঠিকভাবে করার জন্য একদিকে যেমন একটি নীতিমালা দরকার তেমনি দরকার কিছু ট্রেনিং। দরকার একজন দক্ষ লিডার যে তার টিমকে এগিয়ে নিয়ে যাবার যোগ্যতা ও দক্ষতা রাখে। নিজে শিখবে এবং শেখাবে, নিজে কাজ করবে এবং করাবে।

১৯৯৯ সালের শেষে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে স্টোর সহকারী হিসেবে যে যাত্রা শুরু করেছিলাম তা এখনো চলমান। মাঝে আমার কোম্পানির বিদেশের একটা কারখানার স্টোর অর্গানাইজ করার জন্য আমন্ত্রিত হই। মালিকের চাওয়া অনুযায়ী কাজ করার জন্য নগদ অর্থ পুরস্কারও পেয়েছি। বর্তমানে আমি স্টোরের কাজ করার পাশাপাশি অন্যান্য ডিপার্টমেন্টকেও সহযোগিতা করি। হাউজকিপিং, এক্সেল, নিরাপত্তা, প্রশাসন ও অর্গানাইজেশন ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদি ক্ষেত্রেও আমার কাজ করার অভিজ্ঞতা হয়েছে।

আশা করছি উপরের পরামর্শগুলো মেনে চললে একটি পোশাক শিল্প কারখানার স্টোরকে আদর্শ স্টোর হিসেবে গণনা করা যাবে।

প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

মৈত্রী/ জেইউ/ এএ

Banner