মধুর আশ্চর্য গুনাগুন ও উপকারিতা

লাইফস্টাইল ডেস্ক, মৈত্রী অনলাইন
প্রকাশ: শুক্রবার, ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সময়- ৬:৪৪ অপরাহ্ন

Satu-Sendok-Madu-Murni-Setiap-Hari-Madu-Bina-Apiari

ঢাকা: মানব দেহের জন্য মধু অত্যন্ত উপকারী এবং নিয়মিত মধু সেবন করলে অসংখ্য রোগবালায় হতে পরিত্রান পাওয়া যায়। এটি বৈজ্ঞানিকভাবেই প্রমানিত। হাজার বছর পূর্বেও মধু ছিল সমান জনপ্রিয়। ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অনেক সভ্যতায় মধু ‘ঔষধ’ হিসেবেও ব্যবহৃত হত। মধুতে প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান থাকে। এতে চর্বি এবং প্রোটিন নেই। একশ গ্রাম মধুতে ২৮৮ পরিমাণ ক্যালরি থাকে। গুণে ভরা মধুতে রয়েছে গুকোজ ও ফ্রুকটোজ যা শরীরে শক্তি যোগায়। মধুর অন্যান্য উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এমনকি প্রতিটি পবিত্র ধর্মগ্রন্থেও মধু সেবনের উপকারিতা এবং কার্যকারিতার কথা উল্লেখ রয়েছে। যেমন পবিত্র আল কোরআনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, “আপনার পালনকর্তা মৌমাছিকে আদেশ দিলেনঃ পর্বতে, গাছে ও উঁচু চালে বাড়ি তৈরী কর, এরপর সর্ব প্রকার ফুল থেকে খাও এবং আপন পালনকর্তার উন্মুক্ত পথে চলো। তার পেট থেকে বিভিন্ন রঙের পানীয় নির্গত হয়। তাতে মানুষের জন্য রয়েছে রোগের প্রতিকার। নিশ্চই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন রয়েছে। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে, মিষ্টি হিসেবে, চিকিৎসা ও সৌন্দর্য চর্চা সহ নানাভাবে মধুর ব্যবহার করে আসছে। সুতরাং শরীরের সুস্থতায় মধুর উপকারিতা অনেক। এটা স্পষ্ট যে মধু আমাদের জন্য কতখানি উপকারি।

মধুর যত উপকারিতা:

১। মধু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: সাধারানত প্রাকিতিক মধুতে আছে প্রচুর পরিমাণে মিনারেল, ভিটামিন ও এনজাইম যা শরীরকে বিভিন্ন অসুখ বিসুখ থেকে রক্ষা করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও প্রতিদিন সকালে এক চামচ মধু খেলে ঠান্ডা লাগা, কফ, কাশি ইত্যাদি সমস্যা কমে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হলে প্রতিদিন হালকা গরম পানির সাথে মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে খান।

২। ওজন কমায় মধু: আপনি যদি প্রতিদিন সকালে মধু খান তাহলে আপনার বাড়তি ওজন কমবে। বিশেষ করে যদি পারেন সকালে খালি পেটে হালকা গরম পানিতে লেবুর রস ও মধু মিশিয়ে খান এতে করে বেশ খানিকটা ওজন কমে যায় কিছুদিনের মধ্যেই। এছাড়াও এভাবে প্রতিদিন নিয়মিত মধু খেলে লিভার পরিষ্কার থাকে, শরীরের বিষাক্ত উপাদান গুলো বের করে দেয় এবং শরীরের মেদ গলে বের হয়ে যায়।

৩। মধু খেলে বুদ্ধি বাড়ে: মধু যে শুধু আপনার কায়িক শক্তি বাড়ায়, তা নয়। আপনি নিয়মিত প্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে এক চামচ মধু খাবেন, কারন ঘুমানোর আগে এক চামচ মধু মস্তিষ্কের কাজ সঠিক ভাবে চালাতে খুব সাহায্য করে ফলে আপনার মস্তিষ্কের শক্তি তথা বুদ্ধির জোর বেড়ে যাবে। যে কোনো কাজে কর্মে আপনার মগজ আগের চেয়ে বেশি কাজ করবে। যাদের সাধারণত মাথা খাটিয়ে কাজ করতে হয়, তাদের জন্য মধু এনে দেবে নতুন উদ্যম ও সৃষ্টিশীলতা।

৪। হৃৎপিণ্ডের সমস্যার ঝুঁকি হ্রাস করতে মধু- মধুর সাথে দারচিনির গুঁড়ো মিশিয়ে খেলে তা রক্তনালীর বিভিন্ন সমস্যা দূর করে এবং রক্তনালী পরিষ্কার করতে সাহায্য করে এবং রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ ১০% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। মধু ও দারচিনির এই মিশ্রণ নিয়মিত খেলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুকি অনেকাংশে কমে যায় এবং যারা ইতিমধ্যেই একবার হার্ট অ্যাটাক করেছেন তাদের দ্বিতীয়বার অ্যাটাকের ঝুকি কমে যায়।

৫। ব্যথা নিরাময়ে: আপনার শরীরের কি জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা? প্রচুর বাতের ওষুধ খেয়েও আজও কোনো ফল পাননি? তাহলে আজ থেকে মধু খাউয়া শুরু করুন। আপনার শরীরে যে অবাঞ্ছিত রসের কারণে বাতব্যামোর জন্ম, সে রস অপসারিত করতে মধু বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। কিছু দিন পর আপনার বাত ব্যাথা সেরে যাবে।

৬। হজমে সাহায্য করে মধু: যাদের নিয়মিত হজমের সমস্যায় ভুগেন তারা প্রতিদিন সকালে নিয়মিত মধু খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন। মধু আপনার পেটের অম্লীয়ভাব কমিয়ে হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। হজমের সমস্যা অনেকাংশে দূর করার জন্য মধু খেতে চাইলে প্রতিবার ভারী খাবারের আগে এক চামচ মধু খেয়ে নিন। বিশেষ করে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে এক চামচ মধু খান।

৭। শক্তি বাড়াতে মধু: মধুতে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনি। এই প্রাকৃতিক চিনি আপনার শরীরে শক্তি যোগায় এবং শরীরকে কর্মক্ষম রাখতে সাহায্য করে। বিশেষ করে যাদের মিষ্টি খাবারের নেশা অনেক আছে তারা অন্য মিষ্টি খাবারের বদলি হিসাবে মধু খেয়ে নিন। কিছু মানুষ আছে যারা সারাক্ষন দূর্বলতায় ভোগেন এবং দেখা যায় এই সমস্যা দূর করার জন্য তারা কিছুক্ষন পর পর চা কফি খায়। এই সমস্যায় যারা ভুগছেন তারা প্রতিদিন সকালে নিয়মিত এক চামচ মধু খেয়ে নিন এবং সারা দিন সবল থাকুন।

৮। যৌন দুর্বলতায়: সাধারণত পুরুষদের মধ্যে যাদের যৌন দুর্বলতা রয়েছে তারা যদি প্রতিদিন মধু ও ছোলা মিশিয়ে খেতে পারেন। তাহলে একটা সময় বেশ উপকার পাবেন। প্রখ্যাত কিছু মধু বিজ্ঞানীদের মতে দৈনিক লিঙ্গে মধু মাখলে লিঙ্গ শক্ত ও মোটা হয় এবং সহবাসে দীর্ঘসময় পাওয়া যায়। নিয়মিত মধু সেবন করলে ধাতু দুর্বল (ধ্বজভঙ্গ) রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৯। রক্ত পরিষ্কারক: এক গ্লাস হালকা গরম পানির সাথে এক বা দুই চামচ মধু এবং এক চামচ লেবুর রস মেশান। পেট খালি করার আগে প্রতিদিন এই মিশ্রিত পানি খান। এটা রক্ত পরিষ্কার করতে অনেক সাহায্য করে। তাছাড়া রক্তনালী গুলোও পরিষ্কার করে থাকে।

১০। হাঁপানি রোধে: আপনি যদি পারেন আধা গ্রাম গুঁড়ো করা গোলমরিচের সাথে সমপরিমাণ মধু এবং আদা মেশান। আপনি দিনে অন্তত তিন বার এই মিশ্রিত পানি খান। এটা হাঁপানি রোধে সহায়তা করবে।

১১। গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে মুক্তি: আপনার হজম সমস্যার সমাধানেও কাজ করে মধু। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে মুক্তি পেতে একজন ব্যক্তি প্রতিদিন নিয়মিত তিন বেলা দুই চামচ করে মধু খেতে পারে। এতে করে গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

১২। মধু আয়ু বৃদ্ধি করে: গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত যারা মধু ও সুষম খাবারে অভ্যস্ত তুলনামূলক ভাবে সেসব ব্যাক্তিরা বেশি কর্মক্ষম ও নিরোগ হয়ে বেঁচে থাকে।

১৩। অনিদ্রা: মধু অনিদ্রার ভালো ওষুধ। রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস পানির সঙ্গে দুই চা চামচ মধু মিশিয়ে খেলে এটি গভীর ঘুম ও সম্মোহনের কাজ করে।

miel-ecologica

রুপচর্চায় মধুর ৬ উপকারিতা জেনে নিন- 

আপনি যদি বলেন, মধুর কাজ কি? এটা খায় না মাথায় দেয়! তবে আমরা বলব, এটা দুটোই করে। শুধুমাত্র আপনার খাবার প্লেটেই নয়, আপনি চাইলে এটি রুপচর্চায় ব্যাবহার করতে পারেন। মধু আপনার ত্বক ও চুলের যত্নে রোজকার রুপচর্চায় জায়গা করে নিতে পারে।

১. মধু যখন ময়েশ্চারাইজ়িং মাস্ক- ত্বক যখন অতিরিক্ত মাত্রাই ড্রাই হয়ে যায় তখন আপনি মুখে মধু লাগাতে পারেন। সুধু ১ চামচ মধু নিয়ে ত্বকে লাগিয়ে নিন। ১৫-২০ মিনিট মধুটা মুখে রেখে হালকা গরম জলে মুখ ধুয়ে নিন।

২. ক্লিনজ়ার হিসাবে মধু- মধু আপনার শরীরে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়া হিসেবে কাজ করে। মধু ত্বকের গভীরে গিয়ে ত্বক পরিষ্কার করে থাকে।সুধু তাই নয়, মধু ত্বকের সুস্বাস্থ্য গড়ে তোলে।

৩. ব্রনের ট্রিটমেন্ট উপাদান মধু- মধুর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান আপনার ব্রণের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে থাকে। আপনার মুখে যদি ব্রন থাকে তাহলে ব্রণের উপর মধু ১০-১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।

৪. সান ট্যান- মধুতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে অ্যান্টি ইনফ্লেমেটরি উপাদান। যা আপনার ত্বকে ট্যান পড়ার সম্ভাবনা অনেকাংশে দূর করে। এই ট্যান পড়া দূর করতে মধু ও অ্যালোভেরা জেল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। ত্বকে মিশ্রণটি লাগিয়ে কিছু সময় অপেক্ষা করুন, যতক্ষণ না তা শুকিয়ে যাচ্ছে। তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন।

৫. চুলের কোমলতা মধু- চুলকে ময়েশ্চারাইজ় করতে আপনি শ্যাম্পুর সঙ্গে মধু মিক্স করে নিন। তারপর চুলে লাগিয়ে কিছু সময় রাখুন তারপর মিশ্রণটি দিয়ে চুল পরিষ্কার করে নিন।চুল ধুয়ে ফেলার পর দেখবেন, আপনার চুল আগের থেকে কেমন কোমল ও ঝলমলে হয়ে গেছে।

৬. হেয়ার কন্ডিশনার- মধু আপনার হেয়ার কন্ডিশনার হিসেবে খুব ভালো কাজ দেয়। যদি পারেন মধু ও নারকেল তেল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। রুক্ষ, শুষ্ক চুলের জন্য এই মিশ্রণটি ভালো কাজ দেয়। মিশ্রণটি ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন।

মধুর অপকারিতা

মধুর তেমন কিছু অপকারিতা নেই। কিন্তু মধু বেশি খাওয়া যায় না, অতিরিক্ত মধু খেলে গাঁয়ের মধ্যে অস্থিরতা বা জ্বলা ভাব হতে পারে। সুতরাং মধু পরিমিত খাওয়া উচিত।

মৈত্রী/এফকেএ/এএ

Banner