পাহাড়ে পানিসংকট মোকাবিলায় ‘ভূমির ওপরের পানি’ ব্যবহারের তাগিদ
মো. হাসান মুন্না :
পাহাড়ে দিন দিন তীব্র হচ্ছে পানিসংকট। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে, শুকিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক ঝিরি–ঝরনা। এই সংকট মোকাবিলা এবং পাহাড়ের প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে ‘ভূমির ওপরের পানি’ (সারফেস ওয়াটার) ব্যবহারের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) বান্দরবান শহরের হোটেল হিলটনের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক ‘মাল্টি–স্টেকহোল্ডার অ্যাডভোকেসি ও শিক্ষা বিনিময় সভা’য় বক্তারা এসব কথা বলেন। পরিবেশ ও প্রতিবেশ পুনরুদ্ধার, টেকসই পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এই সভার আয়োজন করা হয়।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সহায়তায় এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন ইউএসএ–এর অর্থায়নে ‘ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট – প্লেস বেসড ইনিশিয়েটিভ (WRM-PBI)’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় এই সভার আয়োজন করা হয়। বান্দরবানে কর্মসূচিটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন (এইচএফ) ও গ্রাম উন্নয়ন সংস্থা (গ্রাউস)।
সভায় মূল আলোচনায় বক্তারা বলেন, নির্বিচারে পাহাড় কাটা, পাথর উত্তোলন ও বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়ি ছড়া ও ঝরনাগুলো মরে যাচ্ছে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে দুর্গম এলাকাগুলোতে খাবার পানির তীব্র হাহাকার দেখা দেয়। এ অবস্থায় গভীর নলকূপ বসিয়ে ভূগর্ভস্থ পানি তোলার প্রবণতা বেড়েছে, যা পাহাড়ের ভূতাত্ত্বিক কাঠামো ও মাটির আর্দ্রতার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ।
এই বিপর্যয় ঠেকাতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পাহাড়ি ছড়া বা নদীতে ছোট বাঁধ (ড্যাম) দিয়ে পানি আটকে রাখা এবং ঝিরি–ঝরনার উৎসস্থলের বনভূমি সংরক্ষণের মাধ্যমে ভূমির ওপরের পানি ব্যবহারের বিকল্প নেই। বক্তারা আরও জানান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে এবং পাহাড়ের ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।
সভায় সরকারি–বেসরকারি বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, যুব প্রতিনিধি ও পরিবেশকর্মীরা অংশ নেন।
প্রজেক্ট ম্যানেজার কাজী গোলাম মুর্তুজা রাব্বীর সঞ্চালনায় এ সভায় পরিস্থিতি উত্তরণের নানা দিক নিয়ে বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ বান্দরবান এরিয়ার সিনিয়র ম্যানেজার আশীষ কুমার হালদার, পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. নুর হাসান, বন বিভাগের বেতছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ইসমাইল, গ্রাউসের প্রোগ্রাম ম্যানেজার টুলু মারমা।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন তারাছা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান উনুমং মার্মা, রাজভিলা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্য অং প্রু, রাজবিলা তঞ্চঙ্গ্যাপাড়ার কারবারি সুধাংশু তঞ্চঙ্গ্যা।
এছাড়া আরও উপস্থিত ছিলেন হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশনের উখাই ওয়াং, অরণ্য সংস্থার এম এইচ সিং ইয়োপা, ইয়াং লিডারশিপ প্রতিনিধি ডাউকি মারমা–সহ প্রকল্পের সুবিধাভোগী পরিবার এবং স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা।
পরিবেশ সংরক্ষণে কেবল এককভাবে কাজ করলে সুফল মিলবে না উল্লেখ করে সরকারি দপ্তর, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং স্থানীয় কারবারি ও হেডম্যানদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের তাগিদ দেন অংশগ্রহণকারীরা। আগামী দিনে পাহাড়ের পানিসম্পদ রক্ষায় একটি কার্যকর ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের বিষয়ে সবাই একমত পোষণ করেন।