পর্দার আড়ালে একজন করোনাযোদ্ধা ডা. প্রত্যুষ

এন এ জাকির

বান্দরবান : পার্বত্য জেলা বান্দরবানে করোনা সংক্রমন প্রতিরোধে সচেতনতা সৃষ্টি, সামাজিক দুরত্ব বজায় রাখা ইত্যাদি কাজে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তাদের কার্যক্রম চালালেও করোনা আক্রান্ত রোগীর সেবায় পর্দার অন্তরালে সম্মুখ যোদ্ধা হিসেবে দিন রাত কাজ করে যাচ্ছে বান্দরবান সদর হাসপাতালের করোনা আইসোলেশন বিভাগের প্রধান জুনিয়র কনসালটেন্ট ডাক্তার প্রত্যুষ পল ত্রিপুরা। বান্দরবান হাসপাতালে করোনা আক্রান্তদের জন্য আলাদা ১০০ শয্যার আইসোলেশন বেড তৈরী হওয়ার পর থেকে পরিবার ও আক্রান্ত রোগীদের কথা চিন্তা করে টানা ১ মাস হাসপাতালেই অবস্থান করছেন এ যোদ্ধা।

করোনার উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া রোগী, কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত রোগীসহ আইসোলেশন বিভাগে কর্মরত সকল চিকিৎসক, সেবিকা, স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশনা দিয়ে সামনে থেকে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন করোনা আইসোলেশন বিভাগের প্রধান ডা. প্রত্যুষ পল ত্রিপুরা। এমনিতেই বান্দরবান হাসপাতালে চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ সীমিত সরঞ্জাম দিয়ে করোনা আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করা বড় একটা চ্যালেঞ্জ। আর শূন্যহাতে বান্দরবান হাসপাতালের চিকিৎসকরা শুধু সাহস আর সেবার মনোবল নিয়ে সেই চ্যালেঞ্জ পার করছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ পর্যন্ত তিন শতাধিক রোগী আইসোলেশন ফ্লু কর্নার এ চিকিৎসা নিয়েছেন।

হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ১০৪ জন সন্দেহভাজন রোগীর করোনা পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে থাকা ২১ জন চিকিৎসা সেবা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ী ফিরে গেছেন। বর্তমানে নার্সিং কলেজের আইসোলেশনে ভর্তি আছে ৪ জন রোগী। এর মধ্যে ২ জন করোনা আক্রান্ত রোগী। বান্দরবান জেলায় এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৯ জন।

করোনা সংক্রমন শুরু হওয়ার পর বান্দরবান হাসপাতাল সংলগ্ন নার্সিং কলেজকে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ১০০ শয্যার আইসোলেশন বেড তৈরী করা থেকে শুরু করে রোগীদের পরিচর্যা খাবার চিকিৎসক, সেবিকা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের দেখাশোনা, যাতায়াত থেকে শুরু করে সবকাজ একাই সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে করে যাচ্ছেন ডা. প্রত্যুষ পল। চিকিৎসা সামগ্রীসহ সকল ধরনের প্রয়োজনীয় জিনিসের সরবরাহ নিশ্চিত করতে কখনো জেলা পরিষদ, কখনো সিভিল সার্জন কার্যালয়, কখনো পৌরসভায় নিজ উদ্যোগে ছুটে গেছেন তিনি। রোগীদের সুবিধার কথা ভেবে নার্সিং কলেজের দ্বিতীয় তলাতেই ব্যবস্থা করেছেন প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনের। তাদের থাকা-খাওয়াসহ সার্বিক বিষয়ে খেয়াল রাখছেন প্রতিনিয়ত। কখনো কখনো নিজের পকেটের টাকায় কিনে দিচ্ছেন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র।

সন্দেহজনক যেকোনো রোগীর কথা শুনলে নিজেই ছুটে যাচ্ছেন। সবাই যখন করোনার আতঙ্কে পরিবার পরিজন নিয়ে বাসায় অবস্থান করছেন ঠিক তখন পরিবার পরিজন ছেড়ে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালের করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকরা। ডা. প্রত্যুষ পল জানান, করোনা বিশ্বব্যাপী মহামারী আকার ধারণ করেছে। এটা একটা নতুন রোগ। এটার সাথে সবাই পরিচিত নয়। ইতোমধ্যে অনেক চিকিৎসকরাও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তাই সবাই শঙ্কায় দিন পার করছেন। অনেকের আসলে এটা সম্পর্কে ধারনা নেই যে, কীভাবে করোনা রোগীদের চিকিৎসা দিবে। আমি আইসোলেশন ওয়ার্ডের দায়িত্বে আছি। করোনা সম্পর্কে ট্রেনিং নিয়ে এসেছি। তাই সবাইকে এটা সম্পর্কে ধারনা দিতে হচ্ছে। চিকিৎসক, সেবিকা, এমনকি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কর্মীকেও শিখিয়ে দিতে হচ্ছে কীভাবে আক্রান্ত রোগীর সাথে মিশতে হবে, খাবার বা ওষুধ দিতে হবে। তাদেরকে সাহস দেয়ার জন্য আমি নিজে সব করেছি যাতে তারা ভয় না পায়। আমরা চিকিৎসক। সেবার জন্য আমাদের কাছে আসবে। তাই আমরা আমাদের সাধ্যমত সেবা করার চেষ্টা করছি। ১০০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরী করেছি। এখানে করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছে। তাই কীভাবে নিজেদের রক্ষা করে রোগীদের সেবা করবে, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সামগ্রী(পিপিই) কীভাবে পরবে সেগুলো তাদেরকে দেখিয়ে দিচ্ছি। কোন রোগীদের খাবারের সমস্যা হলে তা জোগাড় করার চেষ্টা করছি। মানুষের সেবার ব্রত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। আমার নিজের কোন ভয় নেই। তবে পরিবারের জন্য ভয় হয়। তাই তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে বাসায় হাসপাতালেই থাকছি।

এবিষয়ে বান্দরবান সিভিল সার্জন ডাক্তার অংশৈ প্রু মার্মা বলেন, আমার হাসপাতালে পর্যাপ্ত জনবল ও চিকিৎসা সামগ্রী না থাকলেও যেটুকু আছে সেটুকু দিয়ে আমার চিকিৎসকরা রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। করোনা রোগীদের নিয়ে ডা. প্রত্যুষ পল এবং ডা. আলমগীর উদয় অস্ত নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। যখন ই রোগীর আগমন হচ্ছে তখন ই প্রত্যুষ হাজির হচ্ছেন। শুধু প্রত্যুষ ই নন, ডা. আলমগীরও বেশ প্রশংসনীয় কাজ করছেন। করোনা সন্দেহের রোগীদের নমুনা সংগ্রহ থেকে শুরু করে রিপোর্ট পাঠানোর কাজ ডা. প্রত্যুষ করছেন। আবার প্রশাসনিক কাজগুলো ডা. আলমগীর করছেন। আমরা সবাই ফ্রন্ট লাইনে থেকে যুদ্ধ করছি। তবে আইসোলেশন ওয়ার্ডে যেহেতু করোনা আক্রান্ত রোগী আছেন সেহেতু চিকিৎসকরা সেখানে অধিক ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। সব চিকিৎসকরা ৭ দিন ডিউটি করার পর ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকছেন কিন্তু প্রত্যুষ পল নিরবিচ্ছিন্ন দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তিনি কোন ছুটি নিচ্ছেন না। পরিবার পরিজন ছেড়ে সে হাসপাতালে সময় দিচ্ছেন। সেজন্য আমি তাকে সাধুবাদ জানাই। পাশাপাশি ডা. আলমগীরের জন্যও শুভ কামনা থাকলো। তারা দুজনই খুব পরিশ্রমী। কোভিড-১৯ রোগীদের সেবায় দিন রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

মৈত্রী/ এনএজে/ এএ