দুর্নীতির ধারণা সূচকে ৬ ধাপ অবনমন বাংলাদেশের

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) বাংলাদেশের অবস্থানের ছয় ধাপ অবনমন ঘটেছে। বিশ্বের ১৮০টি দেশ ও অঞ্চলের ২০১৮ সালের দুর্নীতির পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে গতকাল এ সূচক প্রকাশ করেছে বার্লিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি।

টিআইয়ের সিপিআই সূচকে ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী (ভালো থেকে খারাপ) ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এবার ১৪৯তম, যা গতবার ছিল ১৪৩তম। আবার অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) বিবেচনা করলে বাংলাদেশ আগের ১৭তম অবস্থান থেকে ১৩তম অবস্থানে নেমে এসেছে।

১০০ পয়েন্টের ভিত্তিতে এ সূচকে বাংলাদেশের স্কোর এবার ২ পয়েন্ট কমে হয়েছে ২৬। এ স্কেলে শূন্য স্কোরকে দুর্নীতির ব্যাপকতার ধারণায় সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত এবং ১০০ স্কোরকে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত বা সর্বোচ্চ সুশাসনের দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সূচকে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে বাজে অবস্থা কেবল আফগানিস্তানের। অধঃক্রম অনুযায়ী (খারাপ থেকে ভালো) আফগানিস্তানের অবস্থান এবার নবম।

গতকাল সিপিআই ২০১৮-এর বৈশ্বিক প্রকাশ উপলক্ষে ধানমন্ডির কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, ২০১৮ সালে ০-১০০ স্কেলে ২৬ স্কোর পেয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে তালিকার নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম, যা ২০১৭-এর তুলনায় চার ধাপ নিম্নে এবং ঊর্ধ্বক্রম অনুযায়ী ১৪৯তম, যা ২০১৭-এর তুলনায় ছয় ধাপ অবনতি। এছাড়া ২০১৭ সালের তুলনায় বাংলাদেশের স্কোর ২ পয়েন্ট কমেছে। শুধু তা-ই নয়, সূচকে অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে এবারো বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় সর্বনিম্ন, আর এশিয়া-প্যাসিফিকের ৩১টি দেশের মধ্যে অবস্থান চতুর্থ সর্বনিম্ন।

বৈশ্বিক গড় স্কোরের তুলনায় বাংলাদেশের ২০১৮ সালের স্কোর যেমন অনেক কম, তেমনি গতবারের চেয়ে ২ পয়েন্ট কমে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় সর্বনিম্ন স্কোর ও অবস্থানে থাকায় দেশে দুর্নীতির ব্যাপকতা ও গভীরতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দুর্নীতির বিরুদ্ধে আরো কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সরকারের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ২০১৮ সালের সিপিআই অনুযায়ী ৮৮ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক। ৮৭ স্কোর পেয়ে তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে নিউজিল্যান্ড এবং ৮৫ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে ফিনল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড। আর সর্বনিম্ন ১০ স্কোর পেয়ে ২০১৮ সালে তালিকার সর্বনিম্নে অবস্থান করছে সোমালিয়া। ১৩ স্কোর নিয়ে তালিকার সর্বনিম্নের দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে রয়েছে সিরিয়া ও দক্ষিণ সুদান। ১৪ স্কোর পেয়ে তালিকার সর্বনিম্নের তৃতীয় দেশ হিসেবে রয়েছে যথাক্রমে ইয়েমেন ও উত্তর কোরিয়া।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মতো সর্বনিম্ন অবস্থানে না থাকলেও বর্তমান অবস্থান নিয়ে আমাদের আত্মতুষ্টির কোনো সুযোগ নেই। আমাদের অবস্থান এখনো অত্যন্ত দুর্বল এবং বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অত্যন্ত নিচে। অথচ বাংলাদেশের ফলাফল আরো অনেক ভালো হতে পারত এবং সে অবস্থা বা যোগ্যতাও বাংলাদেশের আছে। যেসব কারণে আমাদের ফলাফল আরো ভালো হয়নি বলে মনে করি, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমাদের দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার বা রাজনৈতিক ঘোষণা থাকলেও তার বাস্তব প্রয়োগ হয় না। বিশেষ করে উচ্চপর্যায়ে যাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, খুব কম ক্ষেত্রেই তাদেরকে বিচারের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। আমাদের প্রশাসন ও রাজনীতিতে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। এছাড়া আমাদের ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক খাতে দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিচারহীনতা, সারা দেশে ভূমি-নদী-জলাশয় দখলের প্রবণতা, রাষ্ট্রীয় ক্রয় খাতে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশ থেকে ক্রমবর্ধমান অর্থ পাচার এবং নিয়োগের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক যে প্রভাব বিদ্যমান, সেগুলোও আমাদের ভালো স্কোর না হওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাব রাখতে পারে।

পৃথিবীর কোনো দেশেই শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও তার প্রয়োগ ছাড়া দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ হয় না মন্তব্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, অতি সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার যে ঘোষণা দিয়েছেন, এটি তার রাজনৈতিক সদিচ্ছারই বহিঃপ্রকাশ। তবে এ ঘোষণার কার্যকর ব্যবহার, প্রয়োগ এবং কারো প্রতি ভয় বা করুণা প্রদর্শন না করে এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে একটি জাতীয় দুর্নীতিবিরোধী কৌশল প্রণয়ন অপরিহার্য। বহুমুখী ও সময়াবদ্ধ এমন একটি কৌশল স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় সুষ্ঠুভাবে পরিবীক্ষণসহ বাস্তবায়ন করতে পারলে বাংলাদেশ অবশ্যই এ সূচকে ভালো ফল করবে।

সংবাদ সম্মেলনে বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, ২০১৮ সালের সিপিআই অনুযায়ী বৈশ্বিক দুর্নীতি পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। সূচকে অন্তর্ভুক্ত ১৮০টি দেশের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের অধিক দেশই ৫০-এর কম স্কোর পেয়েছে। এবারের সিপিআই অনুযায়ী, ৬৮ স্কোর ও ঊর্ধ্বক্রম অনুসারে ২৫তম অবস্থান নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ভুটান। এর পরের অবস্থানে রয়েছে ভারত, স্কোর ৪১ ও অবস্থান ৭৮। এরপরে শ্রীলংকা ৩৮ স্কোর পেয়ে ৮৯তম অবস্থানে রয়েছে। ৩৩ স্কোর পেয়ে ১১৭তম অবস্থানে উঠে এসেছে পাকিস্তান এবং ৩১ স্কোর পেয়ে ১২৪তম অবস্থানে নেমে গেছে মালদ্বীপ। অন্যদিকে ৩১ স্কোর পেয়ে ১২৪তম অবস্থানে রয়েছে নেপাল। ২৬ স্কোর নিয়ে ১৪৯তম অবস্থানে বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের পরে ১৬ স্কোর পেয়ে ১৭২তম অবস্থানে রয়েছে আফগানিস্তান। অর্থাৎ নিম্নক্রম অনুসারে আফগানিস্তান ও বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায় যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। সিপিআই সূচক অনুযায়ী ২০১২ সাল থেকে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ষষ্ঠবারের মতো এবারো দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০০৯, ২০১১, ২০১২ ও ২০১৫ সালেও সিপিআইয়ের নিম্নক্রম অনুযায়ী বাংলাদেশ ১৩তম।