ভাষা জাদুঘর, ভাষা আন্দোলনের চর্চা ও গবেষণার সুযোগ তৈরি করবে : হাবীবুল্লাহ সিরাজী

ঢাকা লিগ্যাল ডেস্ক : ভাষা আন্দোলন জাদুঘর দেশের ভাষা প্রেমীদের জন্য ভাষা গবেষণার সুযোগ তৈরির পাশাপাশি গবেষণা বৃত্তিও প্রদান করবে। বাংলা একাডেমির ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউজে অবস্থিত ভাষা জাদুঘর নিয়ে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবীবুল্লাহ সিরাজী।
বাসসে’র সঙ্গে আজ এক সাক্ষাতকারে হাবীবুল্লাহ সিরাজী বলেন, ‘ভাষা আন্দোলন জাদুঘর শুধুমাত্র জাদুঘর হিসেবে থাকার কথা নয়। এর মাধ্যমে আমাদের ভাষা আন্দোলনের চর্চাও করতে হবে। ভাষা গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি, ভাষা গবেষকদের বৃত্তি প্রদান, সাধারণ দর্শক এবং পাঠক যাতে অবাধে এই জাদুঘরে আসতে পারেন সেদিকে দৃষ্টি দেয়াও ভাষা জাদুঘরের অন্যতম কাজ।’
তিনি বলেন, ভাষা জাদুঘরের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, অন্য ভাষার সাথে নিজের ভাষার তুলনামূলক গবেষণার পাশাপাশি নিজ ভাষার মূল সূত্রটি কিংবা শেকড়টি আবিষ্কার। ভাষা জাদুঘর-জাতীয় নিজস্ব পরিচয়ের আত্ম উন্মোচনের সূতিকাগার। তাই, বস্তু সংগ্রহের দিক থেকে জাতীয় জাদুঘর সমৃদ্ধ হতে পারে, কিন্ত ভাষা জাদুঘর সমৃদ্ধ হবে তার ঐতিহাসিক পটভূমিতে।
বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বলেন, ভাষা আন্দোলনের মধ্যে দিয়েই আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি। তিনি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভাষা চেতনার উন্মেষ ঘটাতে একটি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, দেশে ভাষা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলা দরকার। এর মাধ্যমে তরুণ প্রজন্ম ভাষা ও ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে, ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে জানবে এবং চর্চ্চা করবে।’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমি ভাষা আন্দোলন জাদুঘর উদ্বোধন করেন। বাংলা একাডেমির ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউজের দ্বিতীয় তলায় এ জাদৃঘর স্থাপিত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন জাদুঘরে ভাষা আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা, আলোকচিত্র, সংকলন ও বাণীসহ ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংরক্ষণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন জানতে হলে এই জাদুঘর পরিদর্শন করে সহজেই এ সম্পর্কে জানা যাবে। ভাষা গবেষকদের জন্যও এই জাদুঘরটি প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহে সহায়ক হবে।

একই ভবনের একতলায় স্থাপিত হয়েছে জাতীয় সাহিত্য ও লেখক জাদুঘর এবং বাংলা একাডেমি আর্কাইভ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১১ সালের পহেলা ফেব্রুয়ারি জাতীয় সাহিত্য ও লেখক জাদুঘরের উদ্বোধন করেন। এই জাদুঘরে বাংলা ভাষার ইতিহাস, ঐতিহ্য, বাংলা সাহিত্যের লেখক, সাহিত্যিক ও কবিদের জীবন ও কর্ম, তাদের ব্যবহৃত জিনিস পরিদর্শনের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে।
ভাষার মাস জুড়ে অমর একুশে গ্রন্থমেলার পাশাপাশি ভাষা আন্দোলন জাদুঘরে দর্শনার্থীর ভিড়ও বেড়েছে। মানুষ মেলার পাশাপাশি জাদুঘর পরিদর্শনে আসেন। মন্তব্য খাতায় তারা মতামতও প্রকাশ করেন। জাদুঘরের রেজিস্টার খাতায় দেখা যায়, ২ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত জাদুঘরে দর্শনার্থীদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। দায়িত্বরত কর্মচারিদের সাথে কথা বলে জানা যায়, সারাবছরই দর্শনার্থী কমবেশি আসে। তবে, বইমেলার সময় দর্শনার্থীর সংখ্যা কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
ঢাকার নওয়াবগঞ্জের ব্যবসায়ী মো. ফকির আজাদ আত্মার টান থেকেই ভাষা জাদুঘরে আসেন। ২০১০ সালে এই জাদুঘর উদ্বোধন হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর অন্ততঃ একবার এই জাদুঘর পরিদর্শন করেছেন। মাতৃভাষার প্রতি আত্মিক টান থেকেই বার বার ভাষা জাদুঘর পরিদর্শন করেন বলে জানান তিনি।
বাসসে’র সঙ্গে আলাপকালে ফকির আজাদ বলেন, ‘আত্মার টান থেকেই এখানে আসি। এখানে এলে তাঁদের সান্নিধ্য পাওয়া যায় -ভাষার জন্য জীবন দিয়ে যাঁরা আমাদের ঋণি করে গেছেন।’
ভাষা জাদুঘরের সমৃদ্ধির জন্য তার পরামর্শ জানতে চাইলে ফকির আজাদ বলেন, গত আট বছরে ভাষা জাদুঘরের একটু একটু করে উন্নতি হচ্ছে। আশা করি, ক্রমশ এটি আরো সমৃদ্ধ হবে।
বাংলা একাডেমির প্রথম বইমেলার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, মাত্র তেরো বছর বয়সে বড় বোনের হাত ধরে বাংলা একাডেমিতে আয়োজিত প্রথম বই মেলায় এসেছিলাম। সেই প্রথম বইমেলায় ঘাসের ওপর কয়েকটি বই নিয়ে বইমেলা শুরু হয়েছিলো। সেদিন মনে হয়েছিলো, ঘাসের ওপর কয়েকটি ফুল ফুটে আছে। আজ সেই বাংলা একাডেমি মাসব্যাপি বইমেলা করে। এ থেকেই আশা করা যায় এই জাদুঘর কালে কালে আরো সমৃদ্ধ হবে।
শুক্র, শনিবার ও সরকারি ছুটির দিন ছাড়া প্রতিদিন সকাল ১১.০০ টা থেকে ১.০০ টা এবং দুপুর ২.০০টা থেকে বিকেল ৪.০০টা পর্যন্ত এ জাদুঘর সর্ব সাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকে।
তবে, অমর একুশে গ্রন্থমেলা উপলক্ষে এই জাদুঘর প্রতিদিন দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। রোববার থেকে বৃহস্পতিবার প্রতিদিন বিকেল ৩:০০ টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০ টা পর্যন্ত জাদুঘর খোলা থাকবে। এছাড়াও শুক্তবার সকাল ১১:০০ টা থেকে ১২:৩০ ও বিকেল ৩:০০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত এবং শনিবার সকাল ১১:০০ টা থেকে ১:০০ টা ও বিকেল ৩:০০টা থেকে সন্ধ্যা ৬:০০টা পর্যন্ত খোলা থাকবে।