সিঙ্গাপুরকে শীর্ষ অর্থনীতির দেশ বানানোর পেছনের কারিগর

দক্ষিণ পূর্ব-এশিয়ার দ্বীপ রাষ্ট্র সিঙ্গাপুর। ৬৯৯ বর্গকিলোমিটারের স্থলভাগ নিয়ে গড়ে উঠা দেশটি বিশ্বের সেরা শহরগুলোর একটি। ১৯৬৫ সালে দেশটি ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে অল্প সময়েই শক্ত অর্থনীতির ভীত মজবুত করেছে। দেশটির সমৃদ্ধ এ অর্থনীতির পেছনে সবচেয়ে বড় নিয়ামক মনে করা দেশটির পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এদেশের মানুষের পরিচ্ছন্নতা এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতি একধরনের আলাদা টান আছে। পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তুলতে সরকার থেকে শুরু করে ব্যক্তি পর্যায়ের সবাই খুব সচেতন। নিজেরা স্বেচ্ছাসেবী হয়ে পরিচ্ছন্ন নগরী গড়ে তোলার জন্য কাজ করেন। কোন পরিচ্ছন্ন জায়গাতেও চোখে পড়বে দলবেধে পরিচ্ছন্ন অভিযানে নামতে। তবে এ টান একদিনে তৈরি হয়নি। এর পেছনে যে লোকটির সবেচেয়ে বেশি অবদান তিনি হলেন দেশটির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ। ৫০ বছর আগে তিনি দেশটিতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেন।

১৯৬৮ সালে লি বলেছিলেন, আমরা দক্ষিণ এশিয়ার পরিচ্ছন্ন এবং সবুজ দেশ হিসেবে উদাহরণ হয়ে থাকতে চাই। যেকোনভাবে সিঙ্গাপুরকে পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে গড়ে তুলতে লি কুয়ান জরিমানা আরোপ করেন। দেশটিতে একটি সিগারেটের ফেলনা অংশ অথবা একটা ট্যিসু দেখলেও স্বেচ্ছাসেবীরা সেটা ‍তুলে নিয়ে আসেন। ময়লার স্তুপের পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ময়লা রাখার আস্তাকুড় থেকে কোন দুর্গন্ধ আসে না।

দেশটির জনস্বাস্থ্য কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এ্যাডওয়ার্ড ডি সিলভা বলেন, অন্য দেশের আবর্জনায় মাছি, ইদুর, তেলাপোকার জন্ম নিয়ে থাকে। তার বিপরীতে এখানে শুধু মশার প্রকট দেখা গেলেও এটা থেকে ম্যালেরিয়া হওয়ার মতো পরিস্তিতি তৈরি হয় না।

একটি উচ্চ আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লি কুয়ান ইউ পরিচ্ছন্ন এবং সবুজায়নের জন্য পলিসি তৈরি করেছিলেন। যার মধ্যে ছিল জনস্বাস্থ্য আইনকে পরিবর্তন করা, রাস্তার পাশের ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতাদের হকার মার্কেটে স্থানান্তর করা,পয়নিষ্কাশনের জন্য সঠিক ব্যবস্থা করা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ নেয়া। একইভাবে যেসব লোক কাঠের তৈরি বাসায় অবস্থান করতো তাদের আবাসনের ব্যবস্থা করা।

লি কুয়ান সিঙ্গাপুরে যেটা ৫০ বছর আগে শুরু করতে পেরেছিলেন। রাজধানী ঢাকায় সেটা ৪৭ বছর পরেও শুরু করা যায়নি। একটি পরিকল্পিত নগরী গড়ে তুলতে যেসব উদ্যোগ নেয়া দরকার সেটা লক্ষণীয় নয়। নগর বিশেষজ্ঞরা প্রায় এ জন্য দায়ী করেন আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে। যেখানে ‍উন্নত দেশগুলোতে নগরের পুরো দায়িত্ব থাকে মেয়রের হাতে। সেখানে আমাদের কোন একক প্রতিষ্ঠান এখানে কাজ করতে পারে না। ফলে এখানে উন্নয়নের সমন্বয়হীনতার কারণে পরিকল্পিতভাবে নগরী গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। অথচ পরিকল্পিত এবং পরিচ্ছন্ন নগরী দেশের অর্থর্নীতিতে অবদান রাখতে পারে। শুধুমাত্র যানজটের কারণে রাজধানীতে প্রতিদিন ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। যার আর্থিক ক্ষতি বছরে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকার ফলে যাত্রীদের মানসিক চাপ তৈরি হচ্ছে। এই চাপ আবার কাজ করছে অন্যান্য রোগের উৎস হিসেবে। ফলে দেখা যায় তার মধ্যে উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।

লি কুয়ান ইউ এই বিষয়টি বুঝতে পেরেছিলেন ৫০ বছর আগে তিনি বলেছিলেন, নগর পরিচ্ছন্নতার উদ্যোগ মানুষের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিবে, অসুস্থ্যতার হার কমিয়ে দিবে। ফলে ইন্ডাস্ট্রি এবং পর্যটনে প্রবৃদ্ধি বাড়বে।

লি যেসব উদ্যোগ নিয়েছিলেন সেটির মধ্যে উল্লেখ করার মতো হলো সাধারণ মানুষের জন্য গণশিক্ষা কার্যক্রম, স্বাস্থ্য অফিস থেকে এ বিষয়ে লেকচার প্রদান এবং বিভিন্ন খোলা জায়গা পর্যবেক্ষণে রাখা। এছাড়া তখন সবচেয়ে পরিষ্কার এবং সবচেয়ে নোংরা অফিস, দোকান, স্কুল, গণপরিবহন, ফ্যাক্টরিকে সামনে তুলে ধরার একটি প্রতিযোগিতা ছিল।

একটি পরিছন্ন নগরী গড়ে তুলতে লি’র এসব উদ্যোগ পরবর্তীতে অন্যদের মধ্যে ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ে। ৭০ এবং ৮০ দশকে দেশটিতে টয়লেট, ফ্যাক্টরি এবং বাস স্টপিজকে পরিচ্ছন্ন রাখার জন্য ক্যাম্পেইন হয়। যে সময় অভিভাবক, শিক্ষার্থী, সরকারি চাকরিজীবীরা ছুটির দিনে স্কুলগুলোতে পরিষ্কারের কাজ করতেন। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণ বৃক্ষরোপন করতেন। তবে লি এসব করেছিলেন কেবলমাত্র পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলার জন্য নয় বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক দেশ গড়ার কারণেও।

লির এসব উদ্যোগের ফলে সিঙ্গাপুরে অর্থনৈতিক অগ্রগতি হয়েছে। দেশটির প্রত্যাশিত গড় আয়ু এখন ৬৬ বছর থেকে বেড়ে ৮৩ হয়েছে। যা প্রত্যাশিত গড় আয়ুতে বিশ্বের মধ্যে তৃতীয়। ১৯৬৭ সালে দেশটিতে পর্যটক আগমন ছিল ২ লাখ। কিন্তু ২০১৮ সালের প্রথম চার মাসে ১ কোটি পর্যটক এসেছে দেশটিতে। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্যহারে। ১৯৭০ সালে দেশটিতে বিদেশি বিনিয়োগ ছিল ৯৩ মিলিয়ন ডলার। ২০১০ সালে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেয়েছে ৩৯ বিলিয়ন ডলারে। ২০১৭ সালে ৬৬ বিলিয়ন বিদেশি বিনিয়োগ পেয়ে সিঙ্গাপুরে এখন বিশ্বের পঞ্চম সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ পাওয়া দেশের মধ্যে একটি।

কিন্তু এত পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলার যে প্রচারণা এবং কার্যক্রম যে জন্য সিঙ্গাপুরকে খুব বেশি অর্থ খরচ করতে হয়নি। যেমন ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সালে এই চার বছরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম সম্প্রসারণ করতে বছরে ৩ মিলিয়ন ডলার খরচ করেছে দেশটির জাতীয় পরিবেশ সংস্থা। অথচ রাজধানীতে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করেও সেটার সুফল পাওয়া যায় না কেবলমাত্র পরিকল্পিত উন্নয়নের অভাবে। একই সাথে এখানে জনগণের মধ্যে সচেতনতা লক্ষ্য করা যায় না। যেখানে যত্রতত্র ময়লা আর্বজনা ফেলা মানুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দুই বছর আগেই যত্রতত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ময়লা আবর্জনার সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রায় ৬ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল দুই সিটি কর্পোরেশন। রাস্তার ধারে প্রায় সাড়ে ৬ হাজার ডাস্টবিন বসানো হয়েছিল। কিন্তু সিটি কর্পোরেশনের সঠিক তদারকির অভাবে ও জনসাধারণের অসচেতনতার কারণে রাস্তার পাশের এসব ডাস্টবিনের কোন অস্তিতই এখন আর পাওয়া যায় না।

অথচ সিঙ্গাপুরে আপনি যা ইচ্ছা, যেখানে ইচ্ছা তাই করতে পারবেন না। কারণ এখানে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ১৯৬৮ সালে ‘সিঙ্গাপুর ক্লিন ক্যাম্পেইন’ প্রথম জরিমানার মাধ্যমে নাগরিকদের অভ্যাস পরিবর্তনের জন্য উদ্যোগ নেয়। সেই থেকে সিঙ্গাপুরের মানুষ জরিমানার বিধান আগ্রহের সাথে নিয়েছে। শুধুমাত্র অপরিচ্ছন্নতার কারণেই দেশটিতে বছরে প্রায় এক লাখ সংখ্যক জরিমানা করা হয়। যেখানে সর্বনিম্ন জরিমানায় রাখা হয়েছে ২১৭ ডলার।

সিঙ্গাপুরে অনেক আইন আছে যা অনেক সময় বিদেশীদের কাছে বিরক্তিকর মনে হয়। যেমন- সিঙ্গাপুরে চুইংগাম আমদানি করা নিষিদ্ধ; গন্ধ ছড়ায় এমন কোন পণ্য বহনও নিষিদ্ধ; দেশটিতে যেখানে সেখানে থুথু ফেললে জরিমানা করা হয়; আবার কারো ওয়াইফাই অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করলেও জরিমানা হয়ে থাকে। দেশটিতে ইলেকট্রনিক সিগারেটও ইতিমধ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আদতে এসব আইন বিরক্তিকর মনে হলেও সার্বিকভাবে দেশটিকে পরিচ্ছন্ন রাখতে সহায়তা করছে। তাছাড়াও সিঙ্গাপুর জনসাধারণের ব্যবহৃত জায়গা পরিষ্কার করতে বছরে ৮৭ মিলিয়ন ইউএস ডলার ব্যয় করে থাকে।

ঢাকা শহরের উন্মুক্ত জায়গা ও খেলার মাঠ দখল হয়ে যাচ্ছে। যেগুলো আছে সেগুলোরও কোন উন্নয়নের অগ্রগতি অত্যন্ত ঢিলেঢালাভাবে হয়ে থাকে। সিঙ্গাপুরকে উদাহরণ হিসেবে নিলেও পরিকল্পিত উদ্যোগ আর সমন্বয়ের মাধ্যমে রাজধানীকে একটি স্বস্তিদায়ক শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব।